ভারতে “Right to Die with Dignity” বা সম্মানের সঙ্গে মৃত্যুর অধিকার নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে বিতর্ক চলছিল। সেই বিতর্কের মধ্যেই গাজিয়াবাদের হরিশ রানা কেস একটি ঐতিহাসিক মোড় নেয়। এই ঘটনা শুধু একটি পরিবারের কষ্টের গল্প নয়, বরং ভারতের আইন এবং মানবাধিকারের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।

Image
 

কে ছিলেন হরিশ রানা?

হরিশ রানা ছিলেন উত্তরপ্রদেশের গাজিয়াবাদের বাসিন্দা। তিনি একজন মেধাবী ইঞ্জিনিয়ারিং ছাত্র ছিলেন এবং নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে অনেক স্বপ্ন ছিল। কিন্তু একটি দুর্ঘটনা তার পুরো জীবনটাই বদলে দেয়।

দুর্ঘটনার পর কী ঘটেছিল?

২০১৩ সালে পড়াশোনার সময় তিনি একটি ভবনের চতুর্থ তলা থেকে পড়ে যান। এই দুর্ঘটনায় তার মস্তিষ্কে গুরুতর আঘাত লাগে এবং তিনি কোমায় চলে যান। এরপর তিনি প্রায় ১৩ বছর ধরে “Permanent Vegetative State”-এ ছিলেন, যেখানে কোনো সচেতনতা বা স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া থাকে না।

পরিবারের সংগ্রাম

হরিশ রানার পরিবার তাকে বাঁচানোর জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা করে। বছরের পর বছর চিকিৎসা করাতে গিয়ে তাদের আর্থিক অবস্থাও ভেঙে পড়ে। বাড়ি পর্যন্ত বিক্রি করতে হয়। কিন্তু ডাক্তাররা জানিয়ে দেন, তার সুস্থ হওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই।

কেন সুপ্রিম কোর্টে আবেদন করা হয়?

পরিবার শেষ পর্যন্ত সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হয়। তাদের আবেদন ছিল—এভাবে কষ্ট দিয়ে বাঁচিয়ে রাখা কি মানবিক? তারা চান, হরিশ রানা যেন সম্মানের সঙ্গে মৃত্যুবরণ করতে পারেন।

সুপ্রিম কোর্টের ঐতিহাসিক রায়

২০২৬ সালের মার্চ মাসে সুপ্রিম কোর্ট এই মামলায় গুরুত্বপূর্ণ রায় দেয়। আদালত “Passive Euthanasia” বা নিষ্ক্রিয় ইচ্ছামৃত্যুর অনুমতি দেয়। এর অর্থ হলো, জীবন রক্ষাকারী কৃত্রিম ব্যবস্থা ধীরে ধীরে বন্ধ করা হবে, যাতে রোগী স্বাভাবিকভাবে মৃত্যুর দিকে এগোতে পারেন।

চিকিৎসা প্রক্রিয়া কীভাবে সম্পন্ন হয়?

রায়ের পর হরিশ রানাকে দিল্লির AIIMS হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। সেখানে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের তত্ত্বাবধানে ধীরে ধীরে লাইফ সাপোর্ট সরানো হয় এবং তাকে প্যালিয়েটিভ কেয়ার দেওয়া হয়, যাতে শেষ সময়টুকু কষ্টমুক্ত হয়।

শেষ বিদায় ও পরিবারের আবেগ

শেষ মুহূর্তে পরিবারের সদস্যরা তাকে ঘিরে বিদায় জানান। এই মুহূর্তটি ছিল অত্যন্ত আবেগঘন। তারা তাকে শান্তিতে যেতে বলেন এবং তার দীর্ঘ কষ্টের অবসান কামনা করেন।

কেন এই ঘটনা এত গুরুত্বপূর্ণ?

এই ঘটনা ভারতের বিচারব্যবস্থায় একটি নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। এটি প্রমাণ করে যে, শুধু বেঁচে থাকার অধিকারই নয়, সম্মানের সঙ্গে মৃত্যুর অধিকারও গুরুত্বপূর্ণ। ভবিষ্যতে এই রায় একই ধরনের মামলার ক্ষেত্রে পথপ্রদর্শক হিসেবে কাজ করবে।

উপসংহার

হরিশ রানার গল্প শুধু একটি ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি নয়, বরং মানবতা, আইন এবং নৈতিকতার এক গভীর প্রশ্ন তুলে ধরে। এই ঘটনা আমাদের ভাবতে বাধ্য করে—জীবন শুধু বেঁচে থাকার নাম নয়, বরং মর্যাদার সঙ্গেও জড়িত।