Image

চতুর্থ পরিচ্ছেদ: ক্লাইম্যাক্স - আগ্নেয়গিরির বিস্ফোরণ ও এক ঐতিহাসিক রাত দখল

প্রশাসনের লাল চোখ আর মিথ্যে গল্পের জাল দিয়ে তিলোত্তমার রক্তকে মুছে ফেলা সম্ভব ছিল না। ১৪ই আগস্ট, ২০২৪—ভারতবর্ষের স্বাধীনতা দিবসের প্রাক্কাল। কিন্তু সেই রাতে কলকাতা শহর ঘুমাতে যায়নি। এক অভূতপূর্ব দৃশ্যের সাক্ষী থাকল গোটা বিশ্ব। 'মেয়েরা রাত দখল করো' (Reclaim the Night)—এই একটি ডাকে সাড়া দিয়ে রাজপথে নেমে এল লক্ষ লক্ষ নারী। হাতে জ্বলন্ত মশাল, চোখে বিচারের আগুন আর মুখে একটাই শ্লোগান: "উই ওয়ান্ট জাস্টিস!" শ্যামবাজার থেকে গড়িয়াহাট, উত্তর থেকে দক্ষিণ—গোটা শহরটা সেদিন এক বিশাল মিছিলে পরিণত হয়েছিল। বাড়ির ড্রয়িংরুম থেকে বেরোনো মা-বোনেরা সেদিন বুঝিয়ে দিয়েছিলেন, তিলোত্তমা কোনো একার মেয়ে নয়, সে এই দেশের প্রতিটি ঘরের সন্তান।

কিন্তু ক্লাইম্যাক্স তখনও বাকি ছিল। যখন শহরের রাজপথে শান্তির মিছিল চলছে, ঠিক তখনই আরজি কর হাসপাতালের গেট ভেঙে ভেতরে ঢুকল কয়েকশো ভাড়াটে দুষ্কৃতী। পুলিশের নিষ্ক্রিয়তার সুযোগ নিয়ে তারা তছনছ করে দিল হাসপাতালের জরুরি বিভাগ। চারতলার সেই অভিশপ্ত সেমিনার হলের দিকে তাদের নজর ছিল স্পষ্ট—প্রমাণ লোপাটের শেষ এক মরিয়া চেষ্টা। কিন্তু সেই রাতে হাসপাতালের সাধারণ ইন্টার্ন আর জুনিয়র ডাক্তাররা বুক দিয়ে আগলে রেখেছিলেন তিলোত্তমার স্মৃতি। একদিকে দুষ্কৃতীদের তাণ্ডব, অন্যদিকে সাধারণ মানুষের অজেয় প্রতিরোধ—আরজি কর চত্বর সেদিন এক রণক্ষেত্রে পরিণত হয়েছিল। সেই রাতের অন্ধকার যেন বারবার মনে করিয়ে দিচ্ছিল, সত্যকে চাপা দিতে গেলে তা আগ্নেয়গিরির মতো ফেটে বেরোয়।

এই আন্দোলন আর শুধু কলকাতার গলিঘুঁজিতে সীমাবদ্ধ থাকল না। লন্ডন থেকে সিডনি, নিউ ইয়র্ক থেকে টোকিও—বিশ্বের প্রতিটি প্রান্তের মানুষ তিলোত্তমার বিচারের দাবিতে পথে নামল। ইতিহাসের পাতায় লেখা থাকল, এক মেধাবী চিকিৎসকের রক্ত কীভাবে এক ঘুমন্ত জাতিকে জাগিয়ে তুলেছিল। তিলোত্তমা আর ফিরবে না ঠিকই, কিন্তু তাঁর এই লড়াইটা হয়ে দাঁড়াল নারী স্বাধীনতার এক নতুন ইশতেহার। যে সাদা অ্যাপ্রনে কলঙ্ক লাগানোর চেষ্টা করেছিল একদল পিশাচ, সেই অ্যাপ্রনটাই হয়ে উঠল প্রতিবাদের সাদা পতাকা। ক্লাইম্যাক্সটা শেষ হলো না, বরং শুরু হলো এক নতুন যুগের—যেখানে অপরাধীরা সিস্টেমের আড়ালে লুকিয়ে থাকলেও সাধারণ মানুষের তর্জুনী তাদের রেহাই দেবে না।

আজও যখন শহর শান্ত হয়, ট্রামলাইনগুলো যখন নিস্তব্ধে গান গায়, তখন চারতলার ওই জানলা দিয়ে আসা বাতাস ফিসফিস করে বলে যায়—তিলোত্তমা মরেনি। সে বেঁচে আছে প্রতিটি প্রতিবাদী কণ্ঠে, প্রতিটি মশালে আর প্রতিটি সেই মানুষের মনে যারা আজও বিচারের অপেক্ষায় আকাশ পানে তাকিয়ে থাকে। তিলোত্তমার সেই নীল চশমাটা আজ ভেঙেছে ঠিকই, কিন্তু সেটা কোটি কোটি মানুষের চোখ খুলে দিয়েছে। বিচারহীনতার এই কালরাতে সে এক জ্বলন্ত ধ্রুবতারা, যা আমাদের পথ দেখাবে যতক্ষণ না শেষ অপরাধীটা তার যোগ্য সাজা পাচ্ছে।


 Page 4


1 2 3 4