তৃতীয় পরিচ্ছেদ: একটি নিথর দেহ, 'আত্মহত্যা'র নাটক ও এক বাবার দীর্ঘ অপেক্ষা
৯ই আগস্ট সকাল ৯টা। আরজি কর হাসপাতালের চারতলার সেই সেমিনার হলের দরজাটা যখন একটু জোরে ধাক্কা দিয়ে খোলা হলো, তখন হাসপাতালের বাতাস থমকে গিয়েছিল। প্রথম যে সহকর্মী ভেতরে ঢুকেছিলেন, তার আর্তনাদ করিডোরের দেওয়ালে ধাক্কা খেয়ে ফিরে আসছিল। মেঝের নীল ম্যাট্রেসের ওপর পড়ে ছিল তিলোত্তমার নিথর শরীর। চশমাটা ভাঙা, শরীরটা নীল হয়ে গেছে পাশবিক অত্যাচারে। কিন্তু ট্র্যাজেডিটা শুধু ওই মৃত্যুর মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না, আসল নারকীয়তা শুরু হলো তার ঠিক পর থেকেই। খবর পাওয়া মাত্রই পুলিশ আর হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ যখন জায়গাটা ঘিরে ফেলল, তখন তাদের আচরণে অপরাধীকে ধরার চেয়ে সত্য গোপনের তাগিদ ছিল অনেক বেশি স্পষ্ট।
সকাল ১০টা ৪৪ মিনিট নাগাদ তিলোত্তমার বাড়িতে প্রথম ফোনটা গেল হাসপাতাল থেকে। অত্যন্ত নির্দয়ভাবে তাঁর মাকে বলা হলো, "আপনার মেয়ে খুব অসুস্থ, আপনারা ঝটপট হাসপাতালে চলে আসুন।" হন্তদন্ত হয়ে সোদপুর থেকে তাঁর বাবা-মা যখন হাসপাতালের গেটে পৌঁছালেন, তখন শুরু হলো এক অমানবিক নাটক। তাঁদের ভেতরে ঢুকতে বাধা দেওয়া হলো। এক বুক আশঙ্কা আর কান্না নিয়ে ওই বৃদ্ধ বাবা-মা হাসপাতালের গেটে দাঁড়িয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা প্রার্থনা করছিলেন। বেলা ১১টা ১১ মিনিটে আবার ফোন এল—এবার বলা হলো, "আপনার মেয়ে আত্মহত্যা করেছে।" একজন সফল ডাক্তার, যার কয়েক দিন পরেই বিয়ে হওয়ার কথা ছিল, যার চোখে ছিল এক উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ—সে কেন হঠাত করে ডিউটি চলাকালীন সেমিনার হলে গিয়ে আত্মহত্যা করবে? এই সাধারণ যুক্তিটা কর্তৃপক্ষ মানতে নারাজ ছিল।
দীর্ঘ তিন ঘণ্টা তিলোত্তমার বাবা-মাকে গেটের বাইরে দাঁড় করিয়ে রাখা হয়েছিল। যে মেয়েটি এই হাসপাতালের সম্পদ ছিল, তার বাবা-মাকেই আজ ঢুকতে দেওয়া হচ্ছিল না। অভিযোগ ওঠে, এই সময়টুকুর মধ্যেই সেমিনার হলের ভেতরে প্রমাণ লোপাটের মরিয়া চেষ্টা চলছিল। এমনকি ঘটনাস্থলের পাশেই তড়িঘড়ি করে মেরামতির কাজ বা রেনোভেশন শুরু করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল, যাতে অপরাধের কোনো ছিটেফোঁটা চিহ্ন না থাকে। কর্তৃপক্ষ বারবার তিলোত্তমার মৃত্যুকে 'সুইসাইড' বলে চালিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছিল এবং পরিবারের ওপর দেহ সৎকারের জন্য প্রবল চাপ দেওয়া হচ্ছিল। কিন্তু তাঁর সহকর্মীরা এবং সাধারণ ইন্টার্নরা যখন রুখে দাঁড়াল, তখন বোঝা গেল এই লড়াইটা আর শুধু একটা খুনের মামলা নেই—এটা হয়ে দাঁড়িয়েছে এক গভীর ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের অদম্য জেদ।
বিকেল যখন গড়িয়ে আসছিল, তখন মর্গের সামনে দাঁড়িয়ে মৌমিতার বাবা-মা যখন তাঁদের আদরের মেয়ের মুখটা শেষবারের মতো দেখলেন, তাঁদের পৃথিবীটা ওলটপালট হয়ে গেল। সেই নিথর দেহটা শুধু একটা অপরাধের সাক্ষী ছিল না, সেটা ছিল গোটা সিস্টেমের পচনের এক জীবন্ত দলিল। যে শহর তিলোত্তমাকে রক্ষা করতে পারেনি, সেই শহরই সেদিন বিকেলে গর্জে উঠেছিল। ৩ ঘণ্টার সেই অপেক্ষা আর 'আত্মহত্যা'র সেই জঘন্য মিথ্যেটাই ছিল আন্দোলনের প্রথম স্ফুলিঙ্গ। তিলোত্তমা আর ফিরবে না ঠিকই, কিন্তু তাঁর নিথর শরীরটা সেদিন এই বিচারহীনতার সংস্কৃতির গায়ে এক মস্ত বড় চড় মেরে গিয়েছিল। সত্যকে চাপা দেওয়ার হাজারো চেষ্টার মাঝেও তিলোত্তমার সেই রক্তাক্ত লড়াই সেদিনই পৌঁছে গিয়েছিল সাধারণ মানুষের হৃদস্পন্দনে।
Page 3