Image

দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ: কালপুরুষের পদধ্বনি ও সেমিনার হলের সেই রক্তাক্ত ইতিহাস

৯ই আগস্টের সেই রাতটা ছিল আরজি কর হাসপাতালের ইতিহাসে এক কলঙ্কিত অধ্যায়। হাসপাতালের করিডোরগুলো যখন হলুদ আলোয় এক অদ্ভুত নিস্তব্ধতায় ঢাকা, তখন সিসিটিভি ফুটেজে ধরা পড়ছিল এক অশুভ ছায়ার আনাগোনা। সঞ্জয় রায়—যাকে মানুষ বলাও পাপ—সে কোনো সাধারণ বহিরাগত ছিল না। সে ছিল হাসপাতালের সেই বিষাক্ত সিস্টেমের এক অংশ, যে জানত কোন ঘরে কখন সিসিটিভি কাজ করে না। ফুটেজে দেখা যাচ্ছিল, তার গলায় ব্লুটুথ হেডফোন ঝুলছে, চোখে এক জান্তব নেশা। সে একবার করিডোর দিয়ে যাচ্ছে, আবার ফিরে আসছে। বারবার সেমিনার হলের দরজার কাছে গিয়ে সে থমকে দাঁড়াচ্ছিল—ঠিক যেন এক ক্ষুধার্ত হায়না তার শিকারকে নিঃশব্দে মাপছে।

রাত ঠিক ২টো বেজে ৪৫ মিনিট। সঞ্জয় যখন সেমিনার হলের দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকল, তখন মৌমিতা (তিলোত্তমা) গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। টানা ৩৬ ঘণ্টার ডিউটি তাকে এমনভাবে নিস্তেজ করে দিয়েছিল যে সে টেরই পায়নি কখন এক পিশাচ তার শিয়রে এসে দাঁড়িয়েছে। সঞ্জয় জানত, এই ঘরটা বাইরের পৃথিবীর থেকে বিচ্ছিন্ন। শুরু হলো এক নারকীয় ও অসম লড়াই। মৌমিতা যখন জেগে উঠল, তখন তার গলার ওপর এক জোড়া শক্তিশালী হাত চেপে বসেছে। সঞ্জয় তার কণ্ঠনালী এমনভাবে টিপে ধরেছিল যাতে কোনো গগনভেদী আর্তনাদ করিডোরের বাইরে না পৌঁছাতে পারে। চশমাটা মেঝেতে ছিটকে পড়ল, পড়ার টেবিলের বইগুলো ওলটপালট হয়ে গেল, কিন্তু ওই পিশাচের হাত থেকে নিজেকে বাঁচাতে পারল না এক মেধাবী তরুণী।

পরবর্তীতে ময়নাতদন্তের যে রিপোর্ট সামনে এল, তা দেখে অভিজ্ঞ চিকিৎসকদেরও রক্ত হিম হয়ে গিয়েছিল। সাহিত্যের ভাষায় বলতে গেলে, সেই রাতে মৌমিতার ওপর দিয়ে এক প্রলয় বয়ে গিয়েছিল। রিপোর্টে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে উল্লেখ ছিল যে, মৌমিতার কণ্ঠনালী চূর্ণবিচূর্ণ করে দেওয়া হয়েছিল। সঞ্জয়ের সেই জান্তব আক্রমণের তীব্রতা এতটাই ছিল যে মৌমিতার পেলভিক বোন বা কোমরের হাড় পর্যন্ত ভেঙে গিয়েছিল—যা প্রমাণ করে কতটা অমানবিক শক্তি প্রয়োগ করা হয়েছিল তার ওপর। সারা শরীরে নখের আঁচড় আর দাঁতের কামড়ের দাগ সাক্ষী দিচ্ছিল সেই নারকীয়তা। তার ফুসফুসে রক্ত জমে গিয়েছিল এবং মাথায় ছিল একাধিক গভীর আঘাতের চিহ্ন—সম্ভবত দেওয়ালে তার মাথা বারবার ঠুকে দেওয়া হয়েছিল যাতে সে দ্রুত জ্ঞান হারিয়ে ফেলে।

ময়নাতদন্তের প্রতিটি পাতা যেন রক্ত দিয়ে লেখা এক বিভীষিকার মহাকাব্য। চিকিৎসকরা দেখেছিলেন, মৌমিতা শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত লড়েছিল নিজের সম্মান বাঁচাতে; তার নখের নিচে লেগে থাকা চামড়ার অবশিষ্টাংশ সেই মরণপণ লড়াইয়েরই চিহ্ন। অথচ এই বীভৎস তাণ্ডব শেষ করে যখন সঞ্জয় করিডোর দিয়ে বেরিয়ে আসছিল, তখন সিসিটিভিতে তাকে দেখা গিয়েছিল অত্যন্ত স্বাভাবিকভাবে, যেন কিছুই ঘটেনি। ভেতরে তখন নীল ম্যাট্রেসের ওপর পড়ে ছিল বাংলার এক মেধাবী তিলোত্তমার নিথর দেহ। যে হাতগুলো দিয়ে সে হাজারো মানুষের প্রাণ বাঁচিয়েছিল, সেই হাতগুলোই আজ নীল হয়ে কুঁকড়ে আছে শেষ যন্ত্রণায়। ভোরের আলো ফোটার আগে কেউ টেরই পেল না যে আরজি করের সেই নিভৃত কোণে এক উজ্জ্বল নক্ষত্রকে চিরতরে নিভিয়ে দিয়েছে এক জান্তব হায়না।


 Page 2


1 2 3 4