Image
 

পরেশনাথ ও দস্যু রত্নাকর: সুন্দরবনের যম (প্রথম পর্ব)

১৯১০ সাল। অবিভক্ত বাংলার আকাশ তখন সিসার মতো ভারী। কোলকাতা শহর যখন সাহেবদের বুটের শব্দে কাঁপছে, তখন বাংলার দক্ষিণ প্রান্তে সুন্দরবনের লোনা জলে রাজত্ব করছে এক অন্য আইন। সেখানে ব্রিটিশদের নীলকুঠির সাহেবরাও ভয়ে তটস্থ থাকে। কারণ একটাই— দস্যু রত্নাকর। লোকে বলে, রত্নাকর মানুষ নয়, সে বনবিবির অভিশাপ। অন্ধকার রাতে যখন মাতলা নদীর বুক চিরে তার ছিপ নৌকো এগিয়ে আসে, তখন বনের বাঘও নাকি গর্জন থামিয়ে দেয়। লুণ্ঠন, হত্যা আর ত্রাস— এই তিন নিয়েই রত্নাকরের সাম্রাজ্য।

এক নতুন শিকারি: পরেশনাথ রায়চৌধুরীর আগমন

ক্যানিং স্টেশনে যখন ট্রেনটা থামল, তখন চারপাশ কুয়াশায় ঢাকা। ধোঁয়া উগড়ানো ইঞ্জিন থেকে নেমে এলেন এক দীর্ঘদেহী পুরুষ। পরনে সাদা ধুতি-পাঞ্জাবি, ওপরে একটা কালো কোট। চোখে তীক্ষ্ণ চশমা, কিন্তু তার আড়ালে থাকা চোখ দুটো যেন বাজপাখির মতো শিকার খুঁজছে। তিনি পরেশনাথ রায়চৌধুরী। বেঙ্গল পুলিশের এই দুঁদে অফিসারকে কোলকাতা থেকে পাঠানো হয়েছে এক অসম্ভব মিশনের জন্য— রত্নাকরকে জীবিত অথবা মৃত ধরতে হবে।

সুন্দরবনের আতঙ্ক এবং সতর্কবার্তা

ফাঁড়িতে পৌঁছাতেই বৃদ্ধ কনস্টেবল শিবু ঠাকুর কাঁপাকাঁপা গলায় বলল, "কর্তা, এই সুন্দরবনে দু'টো জিনিসের থেকে কেউ বাঁচতে পারে না। এক দক্ষিণ রায়, আর দুই রত্নাকর। আপনি ফিরে যান কর্তা, এই লোনা জল রক্ত চেনে, মায়া চেনে না।" পরেশনাথ চশমাটা মুছে টেবিলের ওপর রাখলেন। বাইরে তখন নোনা বাতাসের শব্দ শোঁ শোঁ করছে। তিনি শান্ত গলায় বললেন, "শিবু বাবু, বাঘ শিকার করতে গেলে বাঘের ডেরাতেই ঢুকতে হয়। রত্নাকর নিজেকে বাঘ ভাবলে, আমি তাকে দেখাব শিকারি কাকে বলে।"

অন্ধকার রাতে প্রথম মুখোমুখি সংঘাত

সেদিন ছিল অমাবস্যা। আকাশে চাঁদ নেই, শুধু জমাট বাঁধা অন্ধকার। পরেশনাথ একটা সাধারণ জেলের নৌকো নিয়ে লন্ঠন নিভিয়ে মাতলা নদীর এক সরু খাঁড়ির মুখে অপেক্ষা করছিলেন। হঠাৎ নদীর নিস্তব্ধতা ভেঙে একটা অদ্ভুত শব্দ এল— ছপ... ছপ... ছপ...। কুয়াশার বুক চিরে বেরিয়ে এল একটা কালো রঙের ছিপ নৌকো। নৌকোর মাথায় দাঁড়িয়ে এক বিশালদেহী মানুষ, হাতে তার চওড়া রামদা। লণ্ঠনের হালকা আলোয় তার মুখটা দেখা গেল— দস্যু রত্নাকর! সে অট্টহাসি দিয়ে চিৎকার করে উঠল, "কে আছিস রে যমের দুয়ারে কড়া নাড়ছিস?" পরেশনাথ অন্ধকারের মধ্যেই বন্দুকের সেফটি ক্যাচটা খুললেন। (চলবে পরবর্তী পর্বে...)


 Page 3


1 2 3 4 5