দস্যু রত্নাকরের গোপন ডেরা (তৃতীয় পর্ব)
চোখে নোনা বালি পড়তেই পরেশনাথ এক মুহূর্তের জন্য পৃথিবী অন্ধকার দেখলেন। রত্নাকরের অট্টহাসি বনের বাতাসে প্রতিধ্বনিত হলো। সে রামদা উঁচিয়ে শেষ আঘাতটা করতে চাইল, কিন্তু পরেশনাথ কেবল অনুমানের ওপর ভিত্তি করে শরীরটা একদিকে সরিয়ে নিলেন। রামদাটা নৌকোর কাঠে বিঁধে গেল। পরেশনাথ দ্রুত পকেট থেকে রুমাল বের করে চোখ মুছে নিলেন। ততক্ষণে রত্নাকর বুঝল সামনাসামনি লড়াইয়ে এই পুলিশ অফিসারের সাথে জেতা কঠিন। সে অন্ধকারের সুযোগ নিয়ে জলে ঝাঁপ দিল এবং অবিশ্বাস্য দ্রুততায় ডুব সাঁতার দিয়ে গভীর জঙ্গলের দিকে অদৃশ্য হয়ে গেল।
হাড়কাঁপানো জঙ্গলের রহস্য
পরেশনাথ হাল ছাড়লেন না। তিনি জানতেন রত্নাকর আহত, তার পায়ে গুলির ক্ষত আছে। তিনি তাঁর দলবল নিয়ে জঙ্গলের কর্দমাক্ত জমিতে নামলেন। ম্যানগ্রোভের শ্বাসমূলগুলো যেন একেকটা বিষাক্ত তলোয়ারের মতো মাটির ওপর দাঁড়িয়ে আছে। একটু ভুল পা ফেললেই বিপদ। হঠাৎ কনস্টেবল শিবু ঠাকুর চিৎকার করে উঠল। দেখা গেল মাটির ওপর রক্তের দাগ। রত্নাকর এই পথেই পালিয়েছে। কিছুদূর যেতেই তারা দেখতে পেলেন এক অদ্ভুত দৃশ্য— ঘন লতাগুল্ম দিয়ে ঢাকা একটা প্রাচীন ভাঙা শিব মন্দির, যার অস্তিত্ব কোনো মানচিত্রে নেই।
এক অশুভ ষড়যন্ত্রের গন্ধ
মন্দিরের ভেতরে টিমটিমে আলো জ্বলছে। পরেশনাথ খুব সাবধানে দেওয়ালে পিঠ দিয়ে ভেতরে ঢুকলেন। ভেতরে গিয়ে তিনি যা দেখলেন তাতে তাঁর রক্ত হিম হয়ে গেল। সেখানে কেবল ডাকাতদের অস্ত্রশস্ত্র নয়, রাখা আছে ব্রিটিশ সরকারের সিলমোহর দেওয়া কিছু সরকারি নথি এবং প্রচুর সোনার মোহর। বোঝা গেল, রত্নাকর কেবল একজন সাধারণ ডাকাত নয়; কোলকাতার কোনো প্রভাবশালী ব্যক্তির মদতে সে সরকারি সম্পত্তি পাচার করছে। এই রহস্য রত্নাকরের অপরাধকে এক নতুন মাত্রা দিল।
অপেক্ষা চূড়ান্ত সংঘাতের
হঠাৎ মন্দিরের পিছন থেকে একটা শাঁখের আওয়াজ শোনা গেল। এটি নিশ্চয়ই কোনো সংকেত! পরেশনাথ বুঝতে পারলেন রত্নাকরের মূল বাহিনী তাঁদের ঘিরে ফেলছে। মন্দিরের চারপাশের ঝোপঝাড় নড়ে উঠল। কয়েক ডজন মশাল একসাথে জ্বলে উঠল অন্ধকারের বুকে। পরেশনাথ তাঁর রিভলভারে শেষ কয়েকটা গুলি পরীক্ষা করে নিলেন। তিনি জানতেন, আজকের রাতটিই হতে চলেছে তাঁর জীবনের দীর্ঘতম রাত। হয় তিনি রত্নাকরকে নিয়ে ফিরবেন, না হয় সুন্দরবনের এই নামহীন মন্দিরের ধুলোয় মিশে যাবেন। (চলবে চতুর্থ পর্বে...)