Image
 

পরেশনাথের শেষ বিচার: একটি যুগের অবসান (শেষ পর্ব)

মন্দিরের ভেতর আগুনের লেলিহান শিখা তখন আকাশ ছুঁতে চাইছে। চারদিকে ভাঙা পাথরের স্তূপ আর ধোঁয়ার কুন্ডলী। রত্নাকর ভেবেছিল পরেশনাথ আগুনের ভয়ে আত্মসমর্পণ করবেন, কিন্তু তিনি জানতেন না যে পরেশনাথের শিরায় তখন বইছে ন্যায়ের আগুন। রক্তমাখা কাঁধ নিয়েই পরেশনাথ আগুনের দেয়াল টপকে এক অভাবনীয় লাফ দিলেন। রত্নাকর কিছু বুঝে ওঠার আগেই পরেশনাথের শক্তিশালী হাতের মুঠোয় তার টুঁটি ধরা পড়ল। দুজনে ছিটকে পড়লেন মন্দিরের বাইরের লোনা কাদার ওপর। সেই মুহূর্তেই আকাশ ভেঙে বৃষ্টি নামল— সুন্দরবনের অঝোর বর্ষণ যেন প্রকৃতির পক্ষ থেকে এক পবিত্র স্নান।

পতন এবং সত্যের জয়

কাদার মধ্যে ধস্তাধস্তি চলছে। রত্নাকর তার শেষ শক্তি দিয়ে রামদা চালাল, কিন্তু পরেশনাথ আজ অপরাজেয়। তিনি রত্নাকরের হাত মুচড়ে দিয়ে তাকে মাটিতে চেপে ধরলেন। রত্নাকর আর্তনাদ করে উঠল, "আমায় ছেড়ে দিন বাবু, কোলকাতার বড় সাহেবরা আমায় বাঁচাবে না, আপনাকেও শেষ করে দেবে!" পরেশনাথ শান্ত কিন্তু বজ্রকঠিন গলায় বললেন, "সাহেবদের বিচার পরে হবে রত্নাকর, আজ বিচার হবে এই সুন্দরবনের লোনা জলের, যার বুকে তুমি হাজারো মায়ের কোল খালি করেছ।" পরেশনাথ তাকে বন্দি করলেন ঠিকই, কিন্তু সেই গোপন চিঠিতে থাকা দুর্নীতির প্রমাণগুলো পকেটে সযত্নে আগলে রাখলেন। তিনি জানতেন, আসল যুদ্ধটা এবার কোলকাতার মসনদে শুরু হবে।

এক নতুন ভোরের অপেক্ষা

পরের দিন ভোরে যখন সূর্য উঠল, মাতলা নদীর জল তখন শান্ত। সুন্দরবনের মানুষ অবাক হয়ে দেখল— কুখ্যাত দস্যু রত্নাকর শিকলবন্দি অবস্থায় পরেশনাথের নৌকোয় বসে আছে। মানুষের চোখে জল, কিন্তু মুখে এক অদ্ভুত প্রশান্তি। পরেশনাথ ক্যানিং স্টেশনের দিকে ফিরছেন। তাঁর শরীর ক্ষতবিক্ষত, জ্বর আসছে, কিন্তু মনে এক অসীম তৃপ্তি। তিনি জানতেন, ব্রিটিশ কমিশনার হয়তো এই অপরাধ ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করবেন, কিন্তু যতদিন তাঁর হাতে ওই চিঠি আছে, সুন্দরবনের রক্ত শোষণকারী কোনো সাহেবই শান্তিতে ঘুমোতে পারবে না।

উপসংহার: ইতিহাসের পাতায় অমরত্ব

কয়েক বছর পর পরেশনাথ রায়চৌধুরী যখন পুলিশের চাকরি থেকে অবসর নিলেন, লোকে তাঁকে 'সুন্দরবনের বাঘ' বলে ডাকতে শুরু করল। সুন্দরবনের বৃদ্ধরা আজও রাতে নৌকোয় বসে দস্যু রত্নাকরের গল্প বলে, কিন্তু সেই গল্পের শেষটা হয় একজন ধুতি-পাঞ্জাবি পরা বীর অফিসারের কথা দিয়ে। পরেশনাথ প্রমাণ করে দিয়ে গেছেন যে, অরণ্য যত গভীরই হোক আর দস্যু যত ভয়ংকরই হোক— ন্যায়ের মশাল যদি একবার জ্বলে ওঠে, তবে অন্ধকার পালাতে বাধ্য। বাংলার ইতিহাসের ধুলোমাখা ফাইলগুলোতে এই কেসটি আজও এক জ্বলন্ত উদাহরণ হয়ে আছে। (সমাপ্ত)


 Page 5


1 2 3 4 5