মাতলা নদীর রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ (দ্বিতীয় পর্ব)
অন্ধকার খাঁড়ির স্তব্ধতা ভেঙে রত্নাকরের অট্টহাসি প্রতিধ্বনিত হতে লাগল। পরেশনাথের নৌকোটা ছোট, কিন্তু তাঁর মনের সাহস পাহাড়ের মতো অটল। রত্নাকরের ছিপ নৌকো থেকে দশ-বারোজন ডাকাত একযোগে চিৎকার করে জলে ঝাঁপিয়ে পড়ল। তাদের হাতে চকচকে তলোয়ার আর বল্লম। পরেশনাথ তাঁর রিভলভার থেকে প্রথম গুলিটা চালালেন আকাশে— এটি ছিল একটি সংকেত। মুহূর্তের মধ্যে বনের ঝোপঝাড়ের আড়াল থেকে আরও তিনটি ছোট নৌকো বেরিয়ে এল, যাতে ছিল সাদা পোশাকের প্রশিক্ষিত পুলিশ বাহিনী।
বুদ্ধি আর শক্তির লড়াই
রত্নাকর বুঝতে পারল সে ফাঁদে পা দিয়েছে। কিন্তু সে দমে যাওয়ার পাত্র নয়। সে তার মাঝিকে চিৎকার করে নির্দেশ দিল নৌকোটিকে মাঝনদীর দিকে নিয়ে যেতে। পরেশনাথ জানতেন, রত্নাকরের নৌকো বড় হওয়ায় গভীর জলে সে বেশি সুবিধা পাবে। তিনি ইশারায় তাঁর মাঝিকে বললেন নৌকোটিকে আরও সরু খাঁড়ির দিকে নিয়ে যেতে, যেখানে জোয়ারের জল কমতে শুরু করেছে। শুরু হলো এক ভয়ানক ধাওয়া। একদিকে ব্রিটিশ আমলের আধুনিক বন্দুক, অন্যদিকে ডাকাতদের দেশি তলোয়ার আর বিষাক্ত তীর।
সুন্দরবনের প্রাকৃতিক বাধা
লড়াই যখন তুঙ্গে, তখন হঠাৎ বনের ভিতর থেকে এক বিকট গর্জন শোনা গেল। ক্ষুধার্ত বাঘের গর্জনে দুপক্ষই এক মুহূর্তের জন্য থমকে গেল। রত্নাকরের দুজন লোক ভয়ে টাল সামলাতে না পেরে জলে পড়ে গেল, আর মুহূর্তের মধ্যে কুমিরের পেটে চলে গেল তারা। পরেশনাথ বুঝলেন, এখানে শত্রু শুধু রত্নাকর নয়, এই জঙ্গল নিজেই এক পরম শত্রু। তিনি সুযোগ বুঝে রত্নাকরের নৌকোর পালের দড়ি লক্ষ্য করে গুলি ছুড়লেন। পাল ছিঁড়ে পড়ে গিয়ে রত্নাকরের গতি একদম কমে গেল।
মুখোমুখি রত্নাকর ও পরেশনাথ
দুটি নৌকো যখন একে অপরের গায়ে এসে লাগল, পরেশনাথ এক লাফে রত্নাকরের নৌকোয় উঠে পড়লেন। রত্নাকর তার বিশাল রামদা নিয়ে তেড়ে এল তাঁর দিকে। পরেশনাথ তাঁর বন্দুকের বাঁট দিয়ে প্রথম আঘাতটা আটকালেন। অন্ধকার রাতে শুরু হলো দুই বীরের মল্লযুদ্ধ। রত্নাকরের গায়ের জোর অসম্ভব, কিন্তু পরেশনাথের লড়াইয়ের কৌশল ছিল দেখার মতো। হঠাৎ রত্নাকর একটি কূট চাল চালল— সে তার পকেট থেকে এক মুঠো নোনা বালি ছুড়ে মারল পরেশনাথের চোখের ওপর। পরেশনাথ কি পারবেন এই অন্ধ অবস্থায় রত্নাকরকে কাবু করতে? (চলবে পরবর্তী পর্বে...)