প্রথম পরিচ্ছেদ: স্বপ্নের উজান বাওয়া ও একটি লড়াকু জীবনের শুরু
২০২৪ সালের ৮ই আগস্ট। তিলোত্তমার (মৌমিতার) জন্য এই দিনটা ছিল আর পাঁচটা লড়াইয়ের দিনের মতোই। কিন্তু তার এই লড়াইয়ের গল্পটা আজকের নয়। মধ্যবিত্ত পরিবারের মেয়ে মৌমিতা যখন থেকে বুঝতে শিখেছিল, সে জানত তাকে নিজের পায়ে দাঁড়াতে হবে মানুষের সেবা করার লক্ষ্য নিয়ে। তার পড়ার টেবিলে স্তূপাকার করা এমবিবিএস-এর মোটা মোটা বইগুলো সাক্ষী ছিল হাজারো বিনিদ্র রাতের। মৌমিতা শুধু একজন ডাক্তার হতে চায়নি, সে হতে চেয়েছিল তার বাবা-মায়ের গর্ব এবং দুস্থ রোগীদের ভরসা। তার সেই উজ্জ্বল চোখের দিকে তাকালে বোঝা যেত, জীবনের প্রতিটা মুহূর্ত সে হিসেব করে চলত এক বড় স্বপ্নের টানে।
ফিরে দেখা যাক ২০২০-২১ সালের সেই বিভীষিকাময় দিনগুলোর কথা, যখন সারা বিশ্ব থমকে গিয়েছিল কোভিড-১৯ বা করোনা ভাইরাসের তান্ডবে। মানুষ যখন ভয়ে ঘরের কোণে নিজেকে লুকিয়ে রাখছে, মৌমিতা তখন ছিল সম্মুখ সমরের এক নির্ভীক সৈনিক। সেই তরুণ বয়সেই পিপিই কিট পরে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ঘাম আর শ্বাসকষ্ট সহ্য করে সে করোনা রোগীদের সেবা করে গেছে। পরিবারের দুশ্চিন্তা ছিল, মা-বাবার ভয় ছিল—কিন্তু মৌমিতার এক কথা ছিল, "আমি যদি আজ পিছিয়ে যাই, তবে আমার এই সাদা কোট আর স্টেথোস্কোপের সম্মান কোথায় থাকবে?" সেই ভয়ংকর দিনগুলোতে সে দেখেছে মৃত্যু মিছিলে মানুষের অসহায়তা, আর সেই অভিজ্ঞতা তাকে আরও শক্ত করে গড়ে তুলেছিল। কোভিডের সেই লড়াই তাকে শিখিয়েছিল কীভাবে প্রতিকূল পরিস্থিতির মাঝেও ধৈর্য ধরে মানুষের প্রাণ বাঁচাতে হয়।
সেই একই তেজ নিয়ে সে আরজি কর হাসপাতালে তার পোস্ট গ্র্যাজুয়েট ট্রেনি হিসেবে কাজ শুরু করে। ৮ই আগস্ট সকালে যখন সে বাড়ি থেকে বেরোচ্ছিল, তার কাঁধে ছিল স্টেথোস্কোপের ভার আর মনে ছিল ৩৬ ঘণ্টার এক বিশাল ডিউটির প্রস্তুতি। মা বারবার বলেছিল শরীরটার দিকে খেয়াল রাখতে, কিন্তু মৌমিতার কাছে তখন ডিউটিই ধর্ম। সারাদিন ওপিডি সামলানো, একের পর এক ক্রিটিক্যাল পেশেন্ট হ্যান্ডেল করা—মৌমিতার চোখে তখন ঘুম থাকলেও তার কাজ এক মুহূর্তের জন্য শিথিল হয়নি। সহকর্মীরা তাকে দেখত এক প্রাণচঞ্চল মেয়ে হিসেবে, যে শত কাজের চাপের মাঝেও সবাইকে ভরসা দিত। কিন্তু সেই হাসপাতালের লাল ইটের করিডোরগুলো যে তার জন্য এক নৃশংস ষড়যন্ত্র লুকিয়ে রেখেছে, তা বোঝার সাধ্য কার ছিল?
রাত যখন ২টো ছাড়িয়ে ৩টের দিকে এগোচ্ছে, শরীরের হাড়গুলো তখন এক মুহূর্তের আরামের জন্য আর্তনাদ করছিল। একটানা দায়িত্ব পালনের পর মৌমিতা ভেবেছিল চারতলার সেই সেমিনার হলে একটু জিরিয়ে নেবে। সেখানে ছিল না কোনো নিরাপত্তা, ছিল না কোনো পাহারাদার। সেই অন্ধকার ঘরের নিস্তব্ধতা মৌমিতাকে হয়তো ক্ষণিকের শান্তি দিয়েছিল, কিন্তু সে জানত না তারই আশেপাশে ঘুরছিল এক কালপুরুষের অশুভ ছায়া। কোভিডের মতো মারণ ভাইরাসের বিরুদ্ধে লড়াই করে যে মেয়ে জিতে ফিরেছিল, সেমিনার হলের সেই অন্ধকার রাতে সে হেরে গেল সমাজের এক পাশবিক ভাইরাসের কাছে। তার স্বপ্নের ডানাগুলো ছিঁড়ে তছনছ করে দেওয়া হলো। ভোরের আলো ফোটার আগে যে তিলোত্তমা আমাদের আলোকবর্তিকা ছিল, তার নিথর দেহটা সাক্ষী হয়ে রইল এক কলঙ্কিত ইতিহাসের।
Newest